Monday, December 7, 2015

লেজকাটা হে উৎসব এবং আমাদের বাংলা একাডেমী

আনিসুর রহমান
আজকে আমাদের বাংলা একাডেমীর কাঁধে সওয়ার হয়ে এবং সংস্কৃতি মণ্ত্রনালয়ের বড় অঙ্কের টাকায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো এক ঔপনিবেশিক কর্পোরেট সাহিত্য উৎসব| আসলে কয় বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা আপত্তিকর হে উৎসবের লেজ কেটে এবারে নাম দেয়া হয়েছ ঢাকা সাহিত্য উৎসব| ভাবখানা এরকম কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন| একে বরং  ’লেজকাটা হে উৎসব’ বলাই যুক্তিযুক্ত!

দেশের জনগণের করের টাকায় ভর করে সংস্কৃতি মন্ত্রী এশিয়াটিক মার্কেটিংয়ের আসাদুজ্জামান নূর সাহিত্যের নামে দেশী বিদেশী বেনিয়া তোষণ ভলোই করেছেন|তাঁর সাথে যোগ দিয়েছেন তাঁর আজ্ঞাবহ বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান|খান সাহেব ইতিপূর্বে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক থাকার সময় পেরিসের বিতর্কিত গিমে জাদুঘরের সাথে দেশের ভাবমূর্তি ঊজ্জ্বলের অজুহাতে গিমে জাদুঘরে বাংলাদেশের প্রাচীন পূরাকীর্তি পাচারের জন্যে প্রাথমিক  যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন|এমনকি এর অংশ হিসেবে তিনি গিমের আমন্ত্রণে প্যারিস ভ্রমণের লোভ সামলাতে পারেননি|কিন্তু বিধিবাম ২০০৭-২০০৮ সালে প্রবল প্রতিবাদের মুখে পূরাকীর্তি পাচারের সেই মাফিয়া উদ্যোগ ঠেকানো হয়েছিল|আজকে যারা লেজকাটা হে উৎসবের পক্ষে রসদ জুগাচ্ছেন পূরাকীর্তি পাচারের সময় তাদের অনেকের ভূমিকাই প্রশ্নবিদ্য ছিল|একেই বলে মানিকে মানিক চেনে|
লেজকাটা হে উৎসব নিয়ে আমার বলার কিছুই ছিল না যদি না ইহা বাংলা একাডেমীকে বগলদাবা করতো এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের টাকার শ্রাদ্ধ না করতো|কোনো কর্পোরেট গোষ্ঠী এবং মাফিয়া চক্র এরকম হাজারটা উৎসব করলেও কিছু বলবো না|আপত্তি তখনই যখন তারা জনগণের করের টাকায় সাহিত্যের নামে পাঁচতাঁরা হোটেলে  মজমা বসিয়ে লেজকাটা জয়ন্তী করবে|
আজ ভাবি আমাদের কবি শামসুর রাহমান বেঁচে থাকলে সাহিত্যের নামে এই কর্পোরেট প্রহসন দেখে কি বলতেন|আজ মনে পড়ে সম্ভবত ২০০২ কি ২০০৩ সালে ধানমণ্ডির বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে ১৭ তরুনের ইংরেজিতে লেখা কবিতা সঙ্কলনের প্রকাশনা উৎসবের প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন বলেছিলেন, আজকে তোমরা যারা বাংলাদেশে জন্মে, বাংলাদেশে বাস করে ইংরেজিতে কবিতা লিখে গদগদ হচ্ছো আখেরে তোমরা কেউ লেখক হবে না|
এ প্রসঙ্গে আরো একটি ঘটনা মনে পড়ে|সম্ভবত ২০০৫ সালের ঘটনা|ইন্ডেপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ঢাকার একটি আনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়|অনষ্ঠানের অপরাপর সকলেই ইংরেজিতে আলোচনা করলেন| শেষে মোক্ষম ঝালটা সুনীলদা ঝারলেন বাংলাতেই|তিনি বললেন, আমি এমন কোনো বিপদে পড়িনি আমাকে বংলাদেশে এসে ইংরেজিতে কথা বলতে হবে|
লেজকাটা হে উৎসবের পক্ষে এর পেছনের কুশীলবরা একটা যুক্তি খাড়া করেছেন, বাংলাদেশের সাহিত্যকে বৈশ্বিক দরবারে তুলে ধরা তাদের উদ্দেশ্য | এটা একটা ছলচাতুরী কথা|আসলে এর মাধ্যমে তারা পারিবারিক এবং করপোরেট যোগাযোগের স্বার্থে বাংলা একাডেমীকে হেলাফেলা ভাবে ব্যবহার করছেন|
লেজকাটা হে উৎসবের অনুষ্ঠানসূচিতে সারা যাকের, আলী যাকের আর আসাদুজ্জামান নূর তিনজনেই এশিয়াটিক মার্কেটিংয়ের হর্তাকর্তা|এর থেকে কি বোঝা যায়? ভয় এখানেই| এর আগে নূর সাহেব লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীতের নাম করে এশিয়াটিককে ৫০ কোটি টাকার কাজ দিয়েছিলেন|
হ্যা, লেজকাটা উৎসবের নামে বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিকতার কথা যারা বলছেন তাদেরকে বলি এটা হতে পারে অনুবাদের মাধ্যমে|এই কাজের জন্যে একাডেমী কর্তা খান সাহেবের যদি লেজকাটা জয়ন্তী করতে হয় তাহলে তার এখানে থাকার দরকারটা কি? 
মূললধারার প্রকাশকদের পাশ কাটিয়ে আমাদের সাহিত্যের আন্তর্জাতিকতা কিভাবে সম্ভব? বাংলা একাডেমী ছেবলামী বন্ধ করে অন্যান্য দেশের একাডেমী বিশেষ করে সুইডিশ একাডেমী, ড্যানিশ একাডেমী এবং ফরাসি একাডেমীর সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারে| একটি জানা কথা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমাদের গুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ বাংলায় লিখেছিলেন|
অনুবাদ মানে এই নয় আমরা শুধু ইংরেজির দিকে ঝুকবো|বাংলা একাডমী দক্ষ অনুবাদক তৈরির জন্যে ফেলোশিপ চালু করতে পারে|এই জন্যে বিশ্ববিদ্যালগুলোর সাথ সংলাপ আয়োজন করা যেতে পারে| বাংলা একাডেমী এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যদি পারে আমাদের প্রকাশনা সমিতির সাথে পরামর্শ করে আমাদের মলধারার প্রকাশকদের প্রণোদনা দিয়ে অন্যদেশের গ্রন্থমেলায় অংশ নেবার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে|

গোথেনবার্গ গ্রন্থমেলার প্রয়োজনে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন লেখক যেমন আহমদ ছফা, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ূন আহমেদ, মঈনুল আহসান সাবের এবং ইমদাদুল হক মিলনের কিছু লেখার বিশষ করে ছোটগল্পের নিদেন পক্ষে ইংরেজিতে অনুবাদ খোঁজ করছিলাম| |এখনো সফল হতে পারিনি| মনে মনে ভাবছি বাংলা একাডেমী করছেটা কি?

0 comments:

Post a Comment